সামাজিক স্তরবিন্যাস কাকে বলে
পৃথিবীতে এমন কোন সমাজ ব্যবস্থা নেই যেখানে স্তরবিন্যাস বা শ্রেণীবিন্যাস নেই। তবে সকল সমাজ ব্যবস্থায় সামাজিক স্তর বিন্যাস একই ধরণের নয়।
সুদীর্ঘ কালের ক্রম বিবর্তনের ফলস্বরূপ গড়ে উঠেছে আজকের এই স্তরবিন্যাস ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। সামাজিক স্তর বিন্যাস বলতে নির্দিষ্ট কোন সমাজের সামাজিক শ্রেণি, বর্ণ এবং স্তর বিন্যাস ভিত্তিক বংশানুক্রমিক ব্যবস্থাকে বুঝায়। তবে বিশ্বের সকল সমাজ ব্যবস্থায় এই ধরণের বংশানুক্রমিক সামাজিক স্তরবিন্যাস রয়েছে, তা ঠিক নয়।
কারণ এই ধরণের সামাজিক স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রভিত্তিক সংস্কৃতি। "Peter Saunders" এর মতে, প্রাগৌতিহাসিক সমাজের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক পেশাজীবী পরিবারগুলোতে সামাজিক স্তর বিন্যাস ছিল না বললেই চলে। বর্তমান বিশ্বের পশ্চিমা
সমাজের স্তরবিন্যাস উচ্চ শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী এই তিন ধরণের আর্থ-সামাজিক স্তরের উপর নির্ভর সামাজিক স্তরায়ন হচ্ছে। এই ধরণের প্রধান শ্রেণীগুলো আবার নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্রেণীতে বিভক্ত যার মূল মাপকাঠী হচ্ছে পেশা।
তাছাড়া, তিনি আরও বলেন যে, সামাজিক স্তর বিন্যাসটি এসেছে মূলত ভূগোলের পাথর কিংবা মাটি সংক্রান্ত স্তর বিন্যাস থেকে। তবে মুল বিষয় হচ্ছে যে উভয়টি এক ধরণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ পর্যন্ত প্রত্যেক সমাজেই কোন না কোনভাবে স্তরবিন্যাসের অস্তিত্ব বিদ্যমান। নৃবিজ্ঞানীগন ও সমাজ বিজ্ঞানীগণ স্তরবিন্যাসের চারটি ধরন বা শ্রেণী বিভাগ এর কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলঃ
(ক) দাসত্ব প্রথা (Slavery)
(খ) সামন্ত প্রথা (Estate System)
(গ) জাতি বর্ণ প্রথা (Caste System)
(ঘ) সামাজিক শ্রেণী পদমর্যাদা (Social Class and Status)
অনেক সমাজ বিজ্ঞানী বিশেষকরে অ্যারিস্টোটল দাসকে জীবন্ত সম্পত্তি (Living Possession) বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে আধিপত্য এবং বশ্যতার স্বাভাবিক পরিণত রূপই দাস প্রথার উদ্ভব হয়। সভ্যতার শুরু থেকেই পৃথিবীতে দাসত্বের রূপ ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
ইউরোপে যারা দাস শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল তাদের কোন ভূসম্পত্তি বা অন্য কোন প্রকার সম্পত্তি ছিল না, এমনকি সব রকমের অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত রাখা হত। তাদেরকে প্রভুর সম্পত্তি বলে গন্য করা হত।
বরং সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য মালিক তাকে যত লাঞ্চনা, গঞ্জনা, মারধর যা কিছুই করুক না কেন তা সমাজে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সমাজে দাসদের জন্য কোন সুবিচার পাওয়া, এমনকি মালিকের বিরুদ্ধে কোন নালিশ পর্যন্ত করার সুযোগ ছিল না।
(৩) দাসকে বাধ্যতামূলক যে কোন কাজ আদেশ করা মাত্র পালন করতে হয়। এতে তার ইচ্ছা, বা অনিচ্ছার কোন মূল্য ছিল না। এমনকি শারীরিক অসুস্থতাকেও অনেক সময় মালিকরা বিবেচনা করত না।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দাস প্রথা মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রথার ফলে অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। তাঁরা যত রকমের কায়িক পরিশ্রম প্রয়োজন সবই দাসরা করত।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত এদেরকে দাসরূপে গণ্য করা হত। সময় অতিক্রান্ত হলে তারা দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারত। কিন্তু পাশ্চাত্য দেশগুলোতে যে ধরণের দাসত্ব প্রথা প্রচলিত ছিল, তার সাথে ভারতীয় দাসত্ব প্রথার তুলনা করা যায় না। কারণ প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রভু বা মালিকের পরিবারের সদস্য হিসেবে দাসকে গণ্য করা হত।
পরিবারভুক্ত পরিজন বর্গের ন্যায় দাসদের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব প্রভূর উপর ন্যস্ত ছিল। এছাড়া বৃদ্ধ বয়সে দাসদের সেবা যত্ন বা ভরণ পোষণ দেওয়া ভারতবর্ষে ধর্মীয় শুভ কাজ বলে মনে করা হত। এছাড়া দাসদের কাজের ব্যাপারে কতটুকু বল প্রয়োগ করতে হবে সে ব্যাপারে সামাজিক সুনির্দিষ্ট আইন ছিল।
আর একটি লক্ষ্যনীয় ব্যাপার এই যে ভারতীয় দাস প্রথা অর্থনীতি দাসত্ব প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। চাষাবাদ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড স্বাধীন কৃষকরা সম্পাদন করত। মোটকথা ভারতীয় সমাজে গৃহদাস ছিল এবং এ'ক্ষেত্রে দাস মনিব সম্পর্ক পাশ্চাত্যের ন্যায় নিষ্ঠুর ও দ্বন্ধ সংঘাতময় ছিল না।
(৩) সামাজিক নীতিগত দিক থেকে দাস প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ফলে পরিশেষে দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা দাস প্রথার দাসদের সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ করা হত তা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন হত।
যন্ত্র যত দিন থাকে তার সমাদর ও ততদিন থাকে। তেমনি যতদিন দাস কর্মতৎপর, ততদিন দাসরা মালিকের কাছে সমাদৃত। সুতরাং দাসপ্রথা একটি সামাজিক শিল্প ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা যায়।
আবার সব দাসের একই মূল্য ছিল না। পারদর্শিতা, স্ত্রী, পুরুষ, বয়স ভেদে দাসদের মধ্যে মর্যাদার তারতম্য দেখা দিত। এছাড়াও সেখানে অতি সাধারণ নাগরিকও ছিল যারা দাস বা মালিকের কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়।
৩) দাস প্রথা সামাজিক স্তরবিন্যাসের অবস্থান তুলে ধরলেও তা কেবলমাত্র দাস প্রথা নির্ভর সমাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন গ্রীক, রোমান এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে তা বিশেষভাবে কার্যকর ছিল।
সুতরাং আধুনিক সমাজে যেখানে দাস প্রথা নীতিগত ভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং কার্যত অধিকাংশ সমাজেই দাসপ্রথা অনুপস্থিত সেখানে অধুনা সমাজের সামাজিক স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে দাস প্রথার বিশ্লেষণ তেমন কোন ভূমিকা রাখে না।
পাঠান ও মোগল আমলে ভারত বর্ষে এই সামন্ত প্রথা চালু ছিল যা ভূমি ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে মধ্যযুগের ইউরোপে যে সামন্ত প্রথা ছিল তা আইনগত অধিকারের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই সামন্ত প্রথার নিচের তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল:
প্রথম এস্টেট- এরা যাজক শ্রেণী এবং রাষ্ট্র শাসন করতো। এরা সমাজে সামাজিক, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে সব ধরণের অধিকার ভোগ করতো। এরা ধর্মের দোহাই দিয়ে চার্চের নামে মানুষকে নানা ভাবে শোষণ করতো।
দ্বিতীয় এস্টেট- এরা যোদ্ধা, এদের কাজ ছিল নগর রাষ্ট্রকে বহিঃশক্তির হাত থেকে রক্ষা করা। এরা অভিজাত শ্রেণীর সম্পদ।
তৃতীয় এস্টেট- এরা সাধারন মানুষের অন্তর্ভুক্ত। এদের কাজ ছিল শুধু উৎপাদন করা, এরা সমাজের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
যাহোক পরবর্তী কালে এ তৃতীয় শ্রেণীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে কমন্স সভা (House of Commons) এবং যাজক সম্প্রদায় ও অভিজাত সম্প্রদায় কে নিয়ে গঠিত হয় লর্ডস সভা (House of Lords)। লর্ডস সভার সদস্যদের মধ্যে এখনও শ্রেণীভিত্তিক বিভাজন পরিলক্ষিত হয়।
মোট কথা মধ্য ইউরোপীয় সমাজে জন্মগ্রহণের মাধ্যমেই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদ্য নিরূপণ করতো। অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে এস্টেটে জন্মগ্রহন করতো, সে ঐ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পদমর্যাদা লাভ করতো। প্রত্যেক এস্টেট এর সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট ছিল।
সামন্ততান্ত্রিক ইংল্যান্ডের সমাজে তিন ধরণের এস্টেট বা স্তর ছিল:
প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল মধ্যস্বত্বভোগী উপ-জমিদার। ভূ-স্বামী জমিদাররা নানা স্তরের অন্তর্ভুক্ত রায়তের নিকট বিভিন্ন ভাবে নগদ টাকা আদায় করত এবং ভোগ করত বিভিন্ন রকম সেবামূলক কাজকর্ম। বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্বত্ব ভোগীদের ভূমিস্বত্বে সীমিত মালিকানা বর্তমান ছিল।
এই মালিকানার ভিত্তিতেই তারা আবার অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্তী স্তর থেকে, কৃষিকাজের একটা লভ্যাংশ ভোগ করত। আবার কোন কোন সময় জমিদারারা তাদের অতি আস্থাভাজন রাজকর্মচারীকে বিভিন্ন ধরণের রায়তীস্বত্ব প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করতো।
এই সব বিভিন্ন কারনে সমাজে সৃষ্টি হত বিভিন্ন ধরণের অধিকার ও দায় দায়িত্বের। সুতরাং বলা যায় প্রাচীন ভারত বর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বঙ্গ দেশের সমাজ ব্যবস্থায় এক জটিল প্রকৃতির স্তর বিন্যাসের সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রাচীনতা, স্থিতিশীলতা এবং ব্যাপকতর দিক থেকে জাতি বর্ণের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হচ্ছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা। তবে এই জাতি বর্ণ ব্যবস্থা প্রাচীন মিসর, জাপান, রোম এবং আধুনিক মায়ানমার, ইউরোপ ও আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান ছিল বা আছে।
ভারতের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ বনাম অস্পৃশ্য নগশুদ্রের আচরণ এবং অন্যদিকে ইউরোপে নিগ্রোদের সাথে শ্বেতকায়দের আচরণ লক্ষ্য করলে এই জাতিবর্ণের আসল রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বস্তুত এই জাতিবর্ণের প্রথা ধর্মীয় পবিত্র এবং অপবিত্র ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ভারতীয় হিন্দুধর্মে চারটি বর্ণ হলো- ব্রাহ্মণ, ক্ষয়িত্র, বৈশ্য এবং শূদ্র।
এই প্রতিটি বর্ণে আবার অসংখ্য জাতি ও উপজাতিতে বিভক্ত। এই চারবর্ণের বাইরে যারা তারা হল অসম্পৃশ্য বা নমশূদ্র। এই জাতি বর্ণগুলো উঁচু নীচু মর্যাদার ভিত্তিতে ক্রমোচ্চভাবে মর্যাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। প্রতিটি ব্যক্তি যে জাতি বর্ণে জন্মগ্রহণ করে, সেই জন্মসুত্রেই সে জাতি বর্ণের সদস্যপদ লাভ করে। কোন ব্যক্তি ইচ্ছা করলেও কোন জাতি বর্ণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
মোটকথা ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই জাতি বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। এই ধরণের জাতি বর্ণ প্রথায় সামাজিক গতিশীলতা প্রায় অসম্ভব।
এই প্রথায় এক বর্ণের লোক অন্য বর্ণের বা গোত্রের মেয়েকে বিবাহ করতে পারে না। স্ব-বর্ণের গভীর মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থাকে। একে আন্তবৈবাহিক গোষ্ঠী বলে।
চলা-ফেরা, উঠা-বসা, খাদ্য আদান-প্রদান, এমনকি রান্না-বান্না পর্যন্ত নিচু বর্ণের হাতে হলে উঁচু বর্ণের শুদ্ধতা রক্ষা হয় না।জাতি মাত্রই তার নিজস্ব আচার-বিচার, বিধিনিষেধ প্রকাশ্যেই বলবৎ করার ব্যবস্থা করে থাকে।জাতির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক হল আজন্ম ও আজীবন। জাতিগত আচার বিচার বা বিধিনিষেধ অমান্য করলে, অমান্যকারীকে তার প্রায়শ্চিত্য করতে হয়।
জাতি ও বর্ণগত বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে বৃত্তি বা পেশা গ্রহণ করা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক।
যেমন- ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল যজন-যাজন; কুমারদের কাছ ছিল হাঁড়ি পাতিল বানানো, ছুতোরদের কাজ কাঠের এবং মুচিরা জুতা তৈরি করত ইত্যাদি।জাতি বর্ণ প্রথায় পদবি ছিল জাতিসূচক;
যেমন-বন্দ্যোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি ব্রাহ্মণ দেব সেন, সেনগুপ্ত, দাসগুপ্ত প্রভৃতি বদ্যিদের জাতিসূচক পদবির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; এছাড়া বৃত্তি বা পেশা সূচক পদবিও বিদ্যমান যেমন-বণিক, গোপ, কর্মকার, অধ্যাপক, বিদ্যাভূষণ ও সচদেব ইত্যাদি।
তবে বিগত কয়েক যুগের শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের কারণে এইসব বর্ণপ্রথা অনেকাংশে নমনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে।
নিচে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সমাজিক শ্রেণী ও মর্যাদার ধারণা দেওয়া হল।
আদিম সমাজ ব্যবস্থা
মধ্যযুগের সমাজ ব্যবস্থা:
আদিম সমাজে কৃষি যুগের সূচনা এবং পরবর্তীকালে তা আস্তে আস্তে শিল্পযুগের আবির্ভাব ঘটার ফলে উৎপাদনের উপকরণ ও হাতিয়ারে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
শিল্প যুগের আরম্ভ হওয়ার ফলে কৃষি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে ব্যাপক হারে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ ঘটতে থাকে।ব্যাপক শ্রম বিভাজনের ফলে বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মীর সৃষ্টি হতে থাকে।আধুনিক সমাজে ব্যাপক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটার ফলে নানা বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হতে থাকে।
দেশী আন্তঃআঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার এবং মহাদেশীয় ও আস্ত মহাদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার ঘটতে থাকে।রাজনীতিতে রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্রের প্রচলন হওয়ার ফলে সমাজে একাধিক শ্রেণী ও মর্যাদা গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটতে থাকে।
উপরোক্ত কারণ ছাড়াও প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসের আরও ২টি কারণ চিহ্নিত করেছেন তা হল ৪ 'সুনাম ও ক্ষমতা'।
কার্ল মার্কসের মতে, উৎপাদন ব্যবস্থাই মানুষের শ্রেণীভেদের ঐতিহাসিক সূত্র যা একটি অর্থনৈতিক সূত্র। এজন্য সম্পদশালী ও পুঁজিপতি ব্যক্তি এবং তার গোষ্ঠী শ্রেণীবিন্যাসের প্রধান স্থান দখল করে আছে। ত
অন্যদিকে অধ্যাপক মার্লিন এবং ম্যালভিন এস, টিউমিন তাঁদের "Foundation of modern sociology series (CH. I.P.P 6-7) এ বলেন "সম্পত্তির তারতম্যের জন্য শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। ক্ষমতার বৈষম্যের জন্য রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয় সুনামের ভিত্তিতে পদমর্যাদা বা সামাজিক স্তরের সৃষ্টি হয়।
সম্পত্তি জীবনের নানাবিধ সম্ভাবনা সৃষ্টি করে আর মর্যাদা সৃষ্টি করে জীবনধারণের বিভিন্ন রীতি। যার ফলে শ্রেণী অভিজাত্যের বৈষম্য সৃষ্টি হয়। উপরোক্ত কারণে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে সামাজিক শ্রেণী ও মর্যাদা, বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
সমাজ বিজ্ঞানী Danial Rossider (১৯৯৭) মনে করেন "যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের প্রায় দেশে লোক সংখ্যাকে বিত্তের দিক থেকে পাঁচ শ্রেণীতে ভাগ করেছেনঃ
(১) উচ্চ বিত্ত শ্রেণী, (২) উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী,৩) নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী, (৪) শ্রমিক শ্রেণী এবং (৫) নিম্ন শ্রেণী। (
(১) উচ্চ-শ্রেণী- রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবি এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষিতগণ এ শ্রেণীভুক্ত।
উপরোক্ত স্তরবিন্যাস সমাাজিক শ্রম মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ণীত হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের শ্লোগান হচ্ছে 'জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভাল"। এ ভিত্তিতে সমাজে স্বীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং সেই হিসেবেই সামাজিক স্তর বিন্যাস বিকশিত হচ্ছে।
স্বজনকে শেয়ার করতে পারেন যাতে করে তারাও এ সম্পর্কে অবগত হতে পারে। আর এই ধরনের আর্টিকেল করতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন, পরিশেষে আর্টিকেলটি করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।💚
ভূমিকা
প্রাচীনকালে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতো। ফলে তখন সমাজে কোন উদ্বৃত্ত পণ্য সম্পর্কে ধারণার উদয় হয়নি। তাই সমাজে তখন কোন স্তরবিন্যাস বা শ্রেণীও ছিল না। যখন থেকে সমাজে উদ্বৃত পণ্য ধারণার উদ্ভব হয়েছে তখন থেকেই শ্রেণীর বা স্তরবিন্যাসের উদ্ভব হয়েছে।সুদীর্ঘ কালের ক্রম বিবর্তনের ফলস্বরূপ গড়ে উঠেছে আজকের এই স্তরবিন্যাস ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। সামাজিক স্তর বিন্যাস বলতে নির্দিষ্ট কোন সমাজের সামাজিক শ্রেণি, বর্ণ এবং স্তর বিন্যাস ভিত্তিক বংশানুক্রমিক ব্যবস্থাকে বুঝায়। তবে বিশ্বের সকল সমাজ ব্যবস্থায় এই ধরণের বংশানুক্রমিক সামাজিক স্তরবিন্যাস রয়েছে, তা ঠিক নয়।
কারণ এই ধরণের সামাজিক স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রভিত্তিক সংস্কৃতি। "Peter Saunders" এর মতে, প্রাগৌতিহাসিক সমাজের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক পেশাজীবী পরিবারগুলোতে সামাজিক স্তর বিন্যাস ছিল না বললেই চলে। বর্তমান বিশ্বের পশ্চিমা
সমাজের স্তরবিন্যাস উচ্চ শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী এই তিন ধরণের আর্থ-সামাজিক স্তরের উপর নির্ভর সামাজিক স্তরায়ন হচ্ছে। এই ধরণের প্রধান শ্রেণীগুলো আবার নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্রেণীতে বিভক্ত যার মূল মাপকাঠী হচ্ছে পেশা।
তাছাড়া, তিনি আরও বলেন যে, সামাজিক স্তর বিন্যাসটি এসেছে মূলত ভূগোলের পাথর কিংবা মাটি সংক্রান্ত স্তর বিন্যাস থেকে। তবে মুল বিষয় হচ্ছে যে উভয়টি এক ধরণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
সামাজিক স্তরবিন্যাস কাকে বলে
কোন সমাজের এক বা একাধিক বিষয়ের মান বা নীতির ভিত্তিতে ক্রমোচ্চভাবে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করাকে, সামাজিক স্তর বিন্যাস বলে। সমাজ বিজ্ঞানিগণ সামাজিক স্তর বিন্যাস কে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। নিম্নে তাঁদের কতিপয় সংজ্ঞা দেওয়া হল:সমাজ বিজ্ঞানী "অগবার্ন ও নিমকফ' তাঁদের Sociology গ্রন্থে বলেন, “সামাজিক স্তরবিন্যসের মূলকথা হচ্ছে সামাজিক অসাম্য। কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় উচ্চাসনে অবস্থান করে এবং সুযোগ সুবিধা ও অধিকারের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে”।
ড্রেসলার এর মতে “সামাজিক স্তরবিন্যাস এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন মান, মর্যাদা ও সম্মানের স্তরে বিভক্ত করা হয়”।
সামাজিক স্তর বিন্যাসের শ্রেণীবিভাগ
সামাজিক স্তর বিন্যাসের শ্রেণীবিভাগ
আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ পর্যন্ত প্রত্যেক সমাজেই কোন না কোনভাবে স্তরবিন্যাসের অস্তিত্ব বিদ্যমান। নৃবিজ্ঞানীগন ও সমাজ বিজ্ঞানীগণ স্তরবিন্যাসের চারটি ধরন বা শ্রেণী বিভাগ এর কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলঃ
(ক) দাসত্ব প্রথা (Slavery)
(খ) সামন্ত প্রথা (Estate System)
(গ) জাতি বর্ণ প্রথা (Caste System)
(ঘ) সামাজিক শ্রেণী পদমর্যাদা (Social Class and Status)
দাসত্ব প্রথা কাকে বলে
সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রাচীনতম রূপ হচ্ছে দাস প্রথা। অসম সামাজিক সম্পর্কের চরম দৃষ্টান্ত এই দাস প্রথা। অতীতে বাংলাদেশের সমাজেও দাস প্রথা বিদ্যমান ছিল। এই দাস সম্পর্কে এল.টি হবহাউস তাঁর বিখ্যাত Fundamentals of Sociology গ্রন্থে বলেন, দাস হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যাকে সমাজের আইন এবং প্রথা অন্যের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হত।চরম অবস্থায় দাস হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে অধিকার বিহীন ব্যক্তি বা মালিকের অস্থাবর সম্পত্তি। সাধারন অবস্থায় দাস হল এমন এক ব্যক্তি যাকে দাস মালিক তার গরু বা গাধার মতই মনে করে এবং গরু-গাধার মতই রক্ষণাবেক্ষণ করে। অতএব দাস প্রথা সমাজের এমন এক অসম ব্যবস্থাকে তুলে ধরে যেখানে কিছু সংখ্যক লোক সম্পূর্ণভাবে বা আংশিক ভাবে অধিকার বঞ্চিত।
অনেক সমাজ বিজ্ঞানী বিশেষকরে অ্যারিস্টোটল দাসকে জীবন্ত সম্পত্তি (Living Possession) বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে আধিপত্য এবং বশ্যতার স্বাভাবিক পরিণত রূপই দাস প্রথার উদ্ভব হয়। সভ্যতার শুরু থেকেই পৃথিবীতে দাসত্বের রূপ ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
ইউরোপে যারা দাস শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল তাদের কোন ভূসম্পত্তি বা অন্য কোন প্রকার সম্পত্তি ছিল না, এমনকি সব রকমের অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত রাখা হত। তাদেরকে প্রভুর সম্পত্তি বলে গন্য করা হত।
দাস প্রথার বৈশিষ্ট্য:
(১) দাসদের একমাত্র পরিচয় সে তার মালিকের সম্পত্তি। যার ফলে তার উপর মালিকের অবাধ কর্তৃত্ব সমাজে স্বীকৃত ছিল। মালিকের ইচ্ছামত তাদের কে দিয়ে যে কোন কাজ করাতে পারত। এতে দাসদের ইচ্ছার কোন মূল্য থাকত না।বরং সামান্য ভুল-ত্রুটির জন্য মালিক তাকে যত লাঞ্চনা, গঞ্জনা, মারধর যা কিছুই করুক না কেন তা সমাজে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সমাজে দাসদের জন্য কোন সুবিচার পাওয়া, এমনকি মালিকের বিরুদ্ধে কোন নালিশ পর্যন্ত করার সুযোগ ছিল না।
(২) সামাজিক জীবনে দাসরা ঘৃণার পাত্র ছিল। তাদের নিজস্ব কোন স্বাধীনতা ছিল না, মালিক যা বলত অকপটে তা পালন করতে বাধ্য থাকত। সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি কোন ধর্মীয় অধিকার ও সুযোগ সুবিধাও তারা ভোগ করতে পারত না। নির্দ্বিধায় সব কিছু মেনে নেওয়াই ছিল তাদের একমাত্র কর্তব্য।
(৩) দাসকে বাধ্যতামূলক যে কোন কাজ আদেশ করা মাত্র পালন করতে হয়। এতে তার ইচ্ছা, বা অনিচ্ছার কোন মূল্য ছিল না। এমনকি শারীরিক অসুস্থতাকেও অনেক সময় মালিকরা বিবেচনা করত না।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দাস প্রথা মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রথার ফলে অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। তাঁরা যত রকমের কায়িক পরিশ্রম প্রয়োজন সবই দাসরা করত।
দেশে দেশে দাসত্ব প্রথার প্রচলন:
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে দাস প্রথার প্রচলন ছিল। তবে সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হল প্রাচীন গ্রীস ও রোম সমাজে এবং অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের দিকে আমেরিকার দক্ষিণ রাজ্যগুলোতে। রীসে ও রোমে দাসদেরকে উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হত। যুদ্ধে পরাজিত সৈন্যদের দাসরূপে বন্দী করে রাখা হত। পরবর্তীতে ইউরোপের অনেক দেশে দাসপ্রথার বিকাশ লাভ করেছিল।ভারত বর্ষে দাস প্রথা নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অনার্যরা ভরতবর্ষে প্রবেশের পর আর্যরা তাদের দাসরূপে গণ্য করতেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধে যাদের কে পরাজিত করত তাদের কে দাস করে রাখত। আবার অভাবের তাড়নায় এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেকে সপরিবারে দাসে পরিণত হতে দেখা যায়।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত এদেরকে দাসরূপে গণ্য করা হত। সময় অতিক্রান্ত হলে তারা দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারত। কিন্তু পাশ্চাত্য দেশগুলোতে যে ধরণের দাসত্ব প্রথা প্রচলিত ছিল, তার সাথে ভারতীয় দাসত্ব প্রথার তুলনা করা যায় না। কারণ প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রভু বা মালিকের পরিবারের সদস্য হিসেবে দাসকে গণ্য করা হত।
পরিবারভুক্ত পরিজন বর্গের ন্যায় দাসদের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব প্রভূর উপর ন্যস্ত ছিল। এছাড়া বৃদ্ধ বয়সে দাসদের সেবা যত্ন বা ভরণ পোষণ দেওয়া ভারতবর্ষে ধর্মীয় শুভ কাজ বলে মনে করা হত। এছাড়া দাসদের কাজের ব্যাপারে কতটুকু বল প্রয়োগ করতে হবে সে ব্যাপারে সামাজিক সুনির্দিষ্ট আইন ছিল।
আর একটি লক্ষ্যনীয় ব্যাপার এই যে ভারতীয় দাস প্রথা অর্থনীতি দাসত্ব প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। চাষাবাদ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড স্বাধীন কৃষকরা সম্পাদন করত। মোটকথা ভারতীয় সমাজে গৃহদাস ছিল এবং এ'ক্ষেত্রে দাস মনিব সম্পর্ক পাশ্চাত্যের ন্যায় নিষ্ঠুর ও দ্বন্ধ সংঘাতময় ছিল না।
দাসত্ব প্রথা বিলুপ্তির কারণ সমূহ:
বর্তমান বিশ্বে দাস প্রথা এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। বর্তমানে চলছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা, যার শোষণের মাত্রা পূর্বের সেই দাসত্ব যুগের শোষণকেও অনেক সময় হার মানায়। পাশ্চাত্যের দাসত্ব প্রথা
বিলুপ্তির কারণসমূহ নিচে উপস্থাপন করা হল:
(১) দেশে দেশে বিভিন্ন ধরণের হাতিয়ার বা-যান্ত্রিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে দাসদের দ্বারা যে উৎপাদন হত তার চেয়ে যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগে অধিক উৎপাদন এবং লাভজনক হওয়ার ফলে দাসদের ব্যবহার আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
(২) যান্ত্রিক শক্তি বিকাশের সাথে সাথে উৎপাদন যন্ত্র হিসাবে দাস শ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হওয়ায় দাসদের কদর কমে যায়।
(৩) সামাজিক নীতিগত দিক থেকে দাস প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ফলে পরিশেষে দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। কেননা দাস প্রথার দাসদের সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ করা হত তা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন হত।
মোটকথা মানুষ যখন সভ্যতার দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হতে থাকল তখনই দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। বর্তমান যুগে মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী, জাত জাতিসংঘের সকল সদস্যদের জন্যই দাস প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এতসব নিয়মকানুন ও আধুনিক সভ্য মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দেখা যায় আধুনিক বিশ্বে লক্ষ কোটি মানুষ দাস হিসেবে এখনও তাদের জীবন যাপন করছে। এমনকি অনেক উন্নত দেশেও দেখা যে, বন্ড সইয়ের মাধ্যমে শ্রমিকদের কে আজীবন বন্দি করে রাখা হয়।
আবার অনেকে অনুন্নত দেশে দেখা যায় জিনিসপত্রের মতই একজন দাসের মালিকানা অর্জন করা যায়। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায় অবৈধ অভিবাসীদের অনেকেই মানবেতর অবস্থায় থেকে জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে শ্রম আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। এর পিছনে হয়তো ঋণশোধ বা অভিবাসক কর্তৃপক্ষের হাত থেকে বাঁচার মতো বিষয়গুলো কাজ করে।
সামাজিক স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে দাস প্রথার সীমাবদ্ধতাঃ
(১) দাসত্ব প্রথা সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটি ধরন বলার চেয়ে একটা শিল্প ব্যবস্থা বলাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ দাসদের শ্রমের উপর গ্রীক রোমান সমাজের অর্থনেতিক ভিত রচিত হয়েছিল। তখন দাসরাই ছিল উৎপাদন প্রক্রিয়ার একমাত্র হাতিয়ার।যন্ত্র যত দিন থাকে তার সমাদর ও ততদিন থাকে। তেমনি যতদিন দাস কর্মতৎপর, ততদিন দাসরা মালিকের কাছে সমাদৃত। সুতরাং দাসপ্রথা একটি সামাজিক শিল্প ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা যায়।
(২) দাস প্রথা সমাজকে মালিক ও ভৃত্যের সম্পর্কে বিভাজন করে। কিন্তু দাস সমাজেও এছাড়া ভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকতে পারে। সমাজে দাস ও মালিকের মধ্যে মর্যাদাগত পার্থক্য প্রকটতর দেখা যায়। যেমন গ্রীক রোমান সমাজে সব মনিব সমসংখ্যক দাসের মালিক ছিল না। দাস প্রথার সব মালিক সম পরিমাণ অর্থ ও বিনিয়োগ করতেন না।
আবার সব দাসের একই মূল্য ছিল না। পারদর্শিতা, স্ত্রী, পুরুষ, বয়স ভেদে দাসদের মধ্যে মর্যাদার তারতম্য দেখা দিত। এছাড়াও সেখানে অতি সাধারণ নাগরিকও ছিল যারা দাস বা মালিকের কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়।
৩) দাস প্রথা সামাজিক স্তরবিন্যাসের অবস্থান তুলে ধরলেও তা কেবলমাত্র দাস প্রথা নির্ভর সমাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন গ্রীক, রোমান এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে তা বিশেষভাবে কার্যকর ছিল।
সুতরাং আধুনিক সমাজে যেখানে দাস প্রথা নীতিগত ভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং কার্যত অধিকাংশ সমাজেই দাসপ্রথা অনুপস্থিত সেখানে অধুনা সমাজের সামাজিক স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে দাস প্রথার বিশ্লেষণ তেমন কোন ভূমিকা রাখে না।
সামন্ত প্রথা কাকে বলে ও এর বৈশিষ্ট্য
সামাজিক স্তরবিন্যাসের দ্বিতীয় ধরন হচ্ছে সামন্ত প্রথা বা Estate System। মধ্যযুগের জমিদারি প্রথাই ছিল এই এস্টেটের মূল উৎস। এস্টেট বা সামন্ত বলতে কোন একটি বিষয়কে বুঝায় না। এটি কখনো ভূসম্পত্তি বা খামার কখনো সামজিক শ্রেণী, কখনো বা অধিকার ও কর্তব্যকে বুঝায়।
পাঠান ও মোগল আমলে ভারত বর্ষে এই সামন্ত প্রথা চালু ছিল যা ভূমি ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে মধ্যযুগের ইউরোপে যে সামন্ত প্রথা ছিল তা আইনগত অধিকারের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই সামন্ত প্রথার নিচের তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল:
- প্রতিটি সামন্ত প্রথার সামাজিক মর্যাদা আইনগত স্বীকৃতি ছিল। বিশেষ অর্থে প্রতিটি সামন্ত প্রথার অধিকার, কর্তব্য, সুযোগ-সুবিধা ও বাধ্যবাধকতা আইনগতভাবে স্বীকৃত ছিল।
- প্রতি এস্টেট এর কার্যাবলী নির্ধারিত ছিল। সভ্রান্ত শ্রেণীর কর্তব্য ছিল সবাইকে রক্ষা করা। যাজকদের কাজ ছিল সবার জন্য প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করা এবং সাধারণ মানুষের কাজ ছিল সবার জন্য খাদ্য উৎপাদন করা।
- সামন্ত এস্টেট গুলো ছিল রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যেমন-প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেটের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল সর্বাধিক। তৃতীয় স্টেটের কোন রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।
বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে এস্টেট প্রথাঃ
মধ্যযুগে ইউরোপীয় সমাজ তিনটি এস্টেট বা স্তরে বিভক্ত ছিল:প্রথম এস্টেট- এরা যাজক শ্রেণী এবং রাষ্ট্র শাসন করতো। এরা সমাজে সামাজিক, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে সব ধরণের অধিকার ভোগ করতো। এরা ধর্মের দোহাই দিয়ে চার্চের নামে মানুষকে নানা ভাবে শোষণ করতো।
দ্বিতীয় এস্টেট- এরা যোদ্ধা, এদের কাজ ছিল নগর রাষ্ট্রকে বহিঃশক্তির হাত থেকে রক্ষা করা। এরা অভিজাত শ্রেণীর সম্পদ।
তৃতীয় এস্টেট- এরা সাধারন মানুষের অন্তর্ভুক্ত। এদের কাজ ছিল শুধু উৎপাদন করা, এরা সমাজের সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
যাহোক পরবর্তী কালে এ তৃতীয় শ্রেণীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে কমন্স সভা (House of Commons) এবং যাজক সম্প্রদায় ও অভিজাত সম্প্রদায় কে নিয়ে গঠিত হয় লর্ডস সভা (House of Lords)। লর্ডস সভার সদস্যদের মধ্যে এখনও শ্রেণীভিত্তিক বিভাজন পরিলক্ষিত হয়।
মোট কথা মধ্য ইউরোপীয় সমাজে জন্মগ্রহণের মাধ্যমেই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদ্য নিরূপণ করতো। অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে এস্টেটে জন্মগ্রহন করতো, সে ঐ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পদমর্যাদা লাভ করতো। প্রত্যেক এস্টেট এর সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট ছিল।
সামন্ততান্ত্রিক ইংল্যান্ডের সমাজে তিন ধরণের এস্টেট বা স্তর ছিল:
- উত্তরাধিকারমূলক ভূমিস্বত্ব বা Fee Simple এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সূত্রে ভূমিস্বত্ব ন্যস্ত হত। উত্তরাধিকার না থাকলে ভূমিস্বত্ব গ্রহণ করতেন লর্ড বা রাজাই। তবে ভূমির স্বত্বাধিকারী উইল করতে পারতেন। এ রকম উইল থাকলে ভূমিস্বত্ব বর্তাত উইল অনুসারে। ভূমিস্বত্বের এ প্রথা fee simple নামে পরিচিত।
- বংশধর অনুসারে ভূমিস্বত্ব বা Fee tail এই ধরণের ভূমিস্বত্বের ক্ষেত্রে স্বত্বাধিকারীর অবর্তমানে ভূমিস্বত্ব অর্পন হতো বংশধরদের হাতে। এক্ষেত্রে বংশধর না থাকলেও ভূমিস্বত্ব ফিরে যেত মূল হস্তান্তরকারীর কাছে। এই রকম ভূমিস্বত্বের ক্ষেত্রে কোন উইলের ব্যবস্থা ছিল না।
- জীবনস্বত্বামূলক ভূমিস্বত্ব বা Fee Subsistenceতৃতীয় প্রকার ভূমিস্বত্ব ছিল জীবনস্বত্ব। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির জীবনকাল পর্যন্তই এ ধরণের ভূমিস্বত্ব বহাল থাকত।
ভারতবর্ষে সামন্ত প্রথা
প্রাচীন ভারতবর্ষেও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। তবে বাংলাদেশ ও ভারতে এই সামন্ত প্রথা ছিল একটা স্বতন্ত্র প্রকৃতির। প্রাচীন ভারতে ভূমিস্বত্ব ভিত্তিক জমিদার ও রায়ত এবং মধ্যবর্তী পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্বত্ব ভোগী রায়তের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তবে এই সমস্ত রায়তের সংখ্যা সমান ছিল না।প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল মধ্যস্বত্বভোগী উপ-জমিদার। ভূ-স্বামী জমিদাররা নানা স্তরের অন্তর্ভুক্ত রায়তের নিকট বিভিন্ন ভাবে নগদ টাকা আদায় করত এবং ভোগ করত বিভিন্ন রকম সেবামূলক কাজকর্ম। বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্বত্ব ভোগীদের ভূমিস্বত্বে সীমিত মালিকানা বর্তমান ছিল।
এই মালিকানার ভিত্তিতেই তারা আবার অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্তী স্তর থেকে, কৃষিকাজের একটা লভ্যাংশ ভোগ করত। আবার কোন কোন সময় জমিদারারা তাদের অতি আস্থাভাজন রাজকর্মচারীকে বিভিন্ন ধরণের রায়তীস্বত্ব প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করতো।
এই সব বিভিন্ন কারনে সমাজে সৃষ্টি হত বিভিন্ন ধরণের অধিকার ও দায় দায়িত্বের। সুতরাং বলা যায় প্রাচীন ভারত বর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বঙ্গ দেশের সমাজ ব্যবস্থায় এক জটিল প্রকৃতির স্তর বিন্যাসের সৃষ্টি হয়েছিল।
জাতি-বর্ণ প্রথা কাকে বলে ও এর বৈশিষ্ট্য
সামাজিক স্তরবিন্যাসের আরেকটি রূপ বা প্রকরণ হলো জাতি-বর্ণ প্রথা। স্প্যানিশ শব্দ Casta থেকে ইংরেজী Caste শব্দের উৎপত্তি লাভ করেছে, যার বাংলা প্রতিশব্দ বংশ বা জাতি বা বংশগত গুণাবলী। ঐতিহাসিক ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় এক বিশেষ ধরণের সামাজিক অসমতা ভিত্তিক জাতিভেদ প্রথাকে বুঝানোর জন্য পর্তুগীজরা Caste শব্দটি ব্যবহার করে।প্রাচীনতা, স্থিতিশীলতা এবং ব্যাপকতর দিক থেকে জাতি বর্ণের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হচ্ছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা। তবে এই জাতি বর্ণ ব্যবস্থা প্রাচীন মিসর, জাপান, রোম এবং আধুনিক মায়ানমার, ইউরোপ ও আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান ছিল বা আছে।
ভারতের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ বনাম অস্পৃশ্য নগশুদ্রের আচরণ এবং অন্যদিকে ইউরোপে নিগ্রোদের সাথে শ্বেতকায়দের আচরণ লক্ষ্য করলে এই জাতিবর্ণের আসল রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বস্তুত এই জাতিবর্ণের প্রথা ধর্মীয় পবিত্র এবং অপবিত্র ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ভারতীয় হিন্দুধর্মে চারটি বর্ণ হলো- ব্রাহ্মণ, ক্ষয়িত্র, বৈশ্য এবং শূদ্র।
এই প্রতিটি বর্ণে আবার অসংখ্য জাতি ও উপজাতিতে বিভক্ত। এই চারবর্ণের বাইরে যারা তারা হল অসম্পৃশ্য বা নমশূদ্র। এই জাতি বর্ণগুলো উঁচু নীচু মর্যাদার ভিত্তিতে ক্রমোচ্চভাবে মর্যাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। প্রতিটি ব্যক্তি যে জাতি বর্ণে জন্মগ্রহণ করে, সেই জন্মসুত্রেই সে জাতি বর্ণের সদস্যপদ লাভ করে। কোন ব্যক্তি ইচ্ছা করলেও কোন জাতি বর্ণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
মোটকথা ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই জাতি বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। এই ধরণের জাতি বর্ণ প্রথায় সামাজিক গতিশীলতা প্রায় অসম্ভব।
জাতি বর্ণ প্রথার বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য
জাতি বর্ণ প্রথার বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলোঃ
জাতি বর্ণ প্রথার বংশগত ভাবে এরা বর্ণের সদস্য পদ লাভ করে। অর্থাৎ এই প্রথা বংশানুক্রমিক।
জাতি বর্ণ প্রথার বংশগত ভাবে এরা বর্ণের সদস্য পদ লাভ করে। অর্থাৎ এই প্রথা বংশানুক্রমিক।
এই প্রথায় এক বর্ণের লোক অন্য বর্ণের বা গোত্রের মেয়েকে বিবাহ করতে পারে না। স্ব-বর্ণের গভীর মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থাকে। একে আন্তবৈবাহিক গোষ্ঠী বলে।
চলা-ফেরা, উঠা-বসা, খাদ্য আদান-প্রদান, এমনকি রান্না-বান্না পর্যন্ত নিচু বর্ণের হাতে হলে উঁচু বর্ণের শুদ্ধতা রক্ষা হয় না।জাতি মাত্রই তার নিজস্ব আচার-বিচার, বিধিনিষেধ প্রকাশ্যেই বলবৎ করার ব্যবস্থা করে থাকে।জাতির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক হল আজন্ম ও আজীবন। জাতিগত আচার বিচার বা বিধিনিষেধ অমান্য করলে, অমান্যকারীকে তার প্রায়শ্চিত্য করতে হয়।
জাতি ও বর্ণগত বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে বৃত্তি বা পেশা গ্রহণ করা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক।
যেমন- ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল যজন-যাজন; কুমারদের কাছ ছিল হাঁড়ি পাতিল বানানো, ছুতোরদের কাজ কাঠের এবং মুচিরা জুতা তৈরি করত ইত্যাদি।জাতি বর্ণ প্রথায় পদবি ছিল জাতিসূচক;
যেমন-বন্দ্যোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি ব্রাহ্মণ দেব সেন, সেনগুপ্ত, দাসগুপ্ত প্রভৃতি বদ্যিদের জাতিসূচক পদবির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; এছাড়া বৃত্তি বা পেশা সূচক পদবিও বিদ্যমান যেমন-বণিক, গোপ, কর্মকার, অধ্যাপক, বিদ্যাভূষণ ও সচদেব ইত্যাদি।
তবে বিগত কয়েক যুগের শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের কারণে এইসব বর্ণপ্রথা অনেকাংশে নমনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে।
সামাজিক শ্রেণী ও পদ মর্যাদা
আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানে সামাজিক শ্রেণী ও পদ মর্যাদা বলতে কোন বিশেষ সমাজ কাঠামোর কোন বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অবস্থানকে বুঝায়। এর মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচার আচরণ, দায়-দায়িত্ব, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও মর্যাদা বিন্যাসের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়।বর্তমান যুগে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাস তথা শ্রেণীসমূহের মর্যাদার বিন্যাস ব্যবস্থা সামাজিক শুর বিন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রূপ। কারণ দাস নির্ভর সমাজে দাস প্রথা, মধ্যযুগীয় সামন্ত সমাজের এস্টেট প্রথা এবং ভারতসহ অন্যান্য অঞ্চলের জাতি প্রথা দ্বারা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র অনুধাবন করা যায়।
নিচে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সমাজিক শ্রেণী ও মর্যাদার ধারণা দেওয়া হল।
আদিম সমাজ ব্যবস্থা
- যাদুকর
- পুরোহিত
- সম্পত্তির মালিক
- শ্রমিক শ্রেণী
মধ্যযুগের সমাজ ব্যবস্থা:
- সামন্তবাদী জমিদার
- ভুমিদাস
- কৃষক শ্রেণী
- পুঁজিপতি
- কৃষক শ্রেণী
- শ্রমিক শ্রেণী
আদিম সমাজে কৃষি যুগের সূচনা এবং পরবর্তীকালে তা আস্তে আস্তে শিল্পযুগের আবির্ভাব ঘটার ফলে উৎপাদনের উপকরণ ও হাতিয়ারে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
শিল্প যুগের আরম্ভ হওয়ার ফলে কৃষি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে ব্যাপক হারে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ ঘটতে থাকে।ব্যাপক শ্রম বিভাজনের ফলে বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মীর সৃষ্টি হতে থাকে।আধুনিক সমাজে ব্যাপক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটার ফলে নানা বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হতে থাকে।
দেশী আন্তঃআঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার এবং মহাদেশীয় ও আস্ত মহাদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার ঘটতে থাকে।রাজনীতিতে রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্রের প্রচলন হওয়ার ফলে সমাজে একাধিক শ্রেণী ও মর্যাদা গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটতে থাকে।
উপরোক্ত কারণ ছাড়াও প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসের আরও ২টি কারণ চিহ্নিত করেছেন তা হল ৪ 'সুনাম ও ক্ষমতা'।
কার্ল মার্কসের মতে, উৎপাদন ব্যবস্থাই মানুষের শ্রেণীভেদের ঐতিহাসিক সূত্র যা একটি অর্থনৈতিক সূত্র। এজন্য সম্পদশালী ও পুঁজিপতি ব্যক্তি এবং তার গোষ্ঠী শ্রেণীবিন্যাসের প্রধান স্থান দখল করে আছে। ত
অন্যদিকে অধ্যাপক মার্লিন এবং ম্যালভিন এস, টিউমিন তাঁদের "Foundation of modern sociology series (CH. I.P.P 6-7) এ বলেন "সম্পত্তির তারতম্যের জন্য শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। ক্ষমতার বৈষম্যের জন্য রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয় সুনামের ভিত্তিতে পদমর্যাদা বা সামাজিক স্তরের সৃষ্টি হয়।
সম্পত্তি জীবনের নানাবিধ সম্ভাবনা সৃষ্টি করে আর মর্যাদা সৃষ্টি করে জীবনধারণের বিভিন্ন রীতি। যার ফলে শ্রেণী অভিজাত্যের বৈষম্য সৃষ্টি হয়। উপরোক্ত কারণে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে সামাজিক শ্রেণী ও মর্যাদা, বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
সমাজ বিজ্ঞানী Danial Rossider (১৯৯৭) মনে করেন "যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের প্রায় দেশে লোক সংখ্যাকে বিত্তের দিক থেকে পাঁচ শ্রেণীতে ভাগ করেছেনঃ
(১) উচ্চ বিত্ত শ্রেণী, (২) উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী,৩) নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী, (৪) শ্রমিক শ্রেণী এবং (৫) নিম্ন শ্রেণী। (
(১) উচ্চ-শ্রেণী- রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবি এবং উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষিতগণ এ শ্রেণীভুক্ত।
(২) উচ্চ-মধ্যবিত্ত- উকিল, ডাক্তার, ভূমালিক, কৃষক ও দক্ষ শ্রমিকগণ এ শ্রেণীভূক্ত।
(৩) নিম্ন-মধ্যবিত্ত- স্কুল কলেজের শিক্ষক, অফিসের সাহেবগণ, এই শ্রেণীভূক্ত।
(৪) শ্রমিক শ্রেণী- সাধারণ কৃষক, দর্জি, কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদি।
(৫) নিম্নশ্রেণী-মেথর, চামার, ডোম, দিনমজুর ইত্যাদি এ শ্রেণীভূক্ত।
(৩) নিম্ন-মধ্যবিত্ত- স্কুল কলেজের শিক্ষক, অফিসের সাহেবগণ, এই শ্রেণীভূক্ত।
(৪) শ্রমিক শ্রেণী- সাধারণ কৃষক, দর্জি, কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদি।
(৫) নিম্নশ্রেণী-মেথর, চামার, ডোম, দিনমজুর ইত্যাদি এ শ্রেণীভূক্ত।
উপরোক্ত স্তরবিন্যাস সমাাজিক শ্রম মর্যাদার ভিত্তিতে নির্ণীত হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের শ্লোগান হচ্ছে 'জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভাল"। এ ভিত্তিতে সমাজে স্বীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং সেই হিসেবেই সামাজিক স্তর বিন্যাস বিকশিত হচ্ছে।
লেখকের মন্তব্যঃ
প্রিয় পাঠক উপরোক্ত আর্টিকেলটিতে সামাজিক স্তরবিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আশা করি উত্তরটি পড়ে আর সমাজ সম্পর্কে আপনার ধারণা ক্রমান্বয়ে বাড়বে। যদি আপনি আর্টিকেলটি পড়ে উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে এটি আপনি আপনার বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়স্বজনকে শেয়ার করতে পারেন যাতে করে তারাও এ সম্পর্কে অবগত হতে পারে। আর এই ধরনের আর্টিকেল করতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন, পরিশেষে আর্টিকেলটি করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।💚
বিপ্লব আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রত্যেকটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়
comment url